বহু বছর ধরে নোয়াগাঁওয়ের মানুষ নড়বড়ে টিনের ছাদের নিচে সেজদায় লুটিয়ে পড়েছেন। বর্ষার ফোঁটা, গ্রীষ্মের দাহ, দারিদ্র্যের চাপ — কিছুই তাঁদের ইমানকে নত করতে পারেনি। এখন সেই ইমানের জন্য প্রয়োজন একটি মর্যাদাপূর্ণ পাকা ঘর।
সিলেটের টুকেরবাজারের নোয়াগাঁও (পশ্চিম পাড়া) ছোট্ট হলেও ঈমানের দিক থেকে সমৃদ্ধ এক জনপদ। এখানকার মানুষ পরিশ্রমী, খোদাভীরু ও স্বল্প আয়ে অভ্যস্ত; অল্প জমি, দিনমজুরি আর হালাল রুজির ওপর ভর করেই তাঁদের সংসার চলে।
অভাব, বর্ষা, কাদা, কিংবা দাবদাহ — কোনো কিছুই তাঁদের নামাজ থেকে ফিরিয়ে রাখতে পারেনি। দিনে পাঁচবার, কিশোর থেকে বৃদ্ধ — সবাই মসজিদের পথে হাঁটেন; কারণ আল্লাহর ডাকে সাড়া দেওয়াই তাঁদের জীবনের আসল শান্তি।
টিনের ছাদ দিয়ে বৃষ্টির পানি পড়ে। মুসল্লিরা পানির মধ্যে সিজদা দেন। তবুও নামাজ ছাড়েন না কেউ।
টিনের দেয়াল আর ছাদ গ্রীষ্মে মসজিদকে ভাটির চুলার মতো গরম করে তোলে। বয়োবৃদ্ধরা কষ্টে নামাজ সারেন।
জুমার দিন মসজিদ আর সারা মুসল্লিদের ধারণ করতে পারে না। তখনও আল্লাহর হামদ বলে তাঁরা মাঠে দাঁড়িয়ে সারিবদ্ধ হন।
টিনের ঘর তো অনেক পরের কথা; একসময় নোয়াগাঁওয়ের মুরব্বিরা বাঁশের ছায়ার নিচেই জামাতে দাঁড়াতেন। মাটিতে পাতা মাদুর, অন্তরে খাঁটি নিয়ত, আর আল্লাহর ঘর গড়ার আকুলতা — এই তিনেই শুরু হয়েছিল আমাদের মসজিদের ইতিহাস।
অবশেষে টিন আর বাঁশের একটি ঘর উঠল — সেটি ছিল তখনকার জন্য বড় নিয়ামত। কিন্তু সেই নিয়ামতের সঙ্গেই জুড়ে গেল নতুন কষ্ট। বর্ষা এলেই ছাদ ফোঁটা ফোঁটা চুঁইয়ে পড়ে, সিজদার জায়গায় পানি জমে, আর টিনে বৃষ্টির শব্দে ইমামের তিলাওয়াত পর্যন্ত ঢেকে যায়।
সিলেটের গ্রীষ্ম যখন আগুন ঝরায়, টিনের ছাদ তখন মসজিদকে ভাটির মতো করে তোলে। বয়োবৃদ্ধ, অসুস্থ আর দুর্বল মানুষদের জন্য এই কষ্ট সবচেয়ে বেশি। কেউ কেউ কষ্টে নামাজ সংক্ষিপ্ত করেন, কেউ দূর থেকে ফিরে যান — অথচ হৃদয়টা পড়ে থাকে মসজিদের মধ্যেই।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক দৃশ্য দেখা যায় জুমার দিনে। মুসল্লির সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু মসজিদের জায়গা বাড়েনি। তাই অনেককেই বাইরে, খোলা মাঠে, কখনো রোদে কখনো বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে জামাতে শরিক হতে হয়। তাঁরা নামাজ ছাড়েন না, কিন্তু তাঁদের এমন কষ্টে দাঁড়ানোও উচিত নয়।
একটি মজবুত ইট-কংক্রিটের মসজিদ, যা বহু প্রজন্ম ধরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকবে — বর্ষা, গরম আর সময়ের ক্ষয় থেকে নিরাপদ।
যথেষ্ট জায়গা, আলো-বাতাস আর শীতল পরিবেশ — যেন শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত সবাই প্রশান্ত মনে, মর্যাদার সঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন।
শিশুদের কুরআন, আরবি, আদব ও ইসলামী শিক্ষায় গড়ে তোলার জন্য একটি পাঠচক্র — যাতে আমাদের গ্রামে দ্বীনের আলো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে জ্বলে থাকে।
সদকায়ে জারিয়া মানে হল প্রবাহমান দান — যে দানের সওয়াব মৃত্যুর পরও জারি থাকে।